রবিবার, ১৬ আগস্ট, ২০২৬

Kobir golpo কবির কথা

কবির গল্প সম্পাদক মশায় তাড়া দিচ্ছেন গল্প দিতে হবে। গল্প কি হাটে মাঠে জোটে যে চাইলেই ধরে দেব। হাটে মাঠে বলতে গিয়ে ভূষণ্ডীর মাঠের কথা মনে এলো। তাহলে একটা ভূতের গল্প লিখে ফেলি। ভূতের কথায় জটার চেহারা ভেসে ওঠে। তার মাথায় জট ছিলনা তবে হঠাৎ দেখলে মনে হতো জট আছে। এক মাথা চুল। কখনও চিরুনি পড়েছে বলে মনে হয় না। ওকে ওই রকমই দেখতে অভ্যস্ত। জটার স্কুল বয়স কিন্তু স্কুলে যায় না, কখনও যেতেও দেখিনি। ওর বাবা কাজ পেলে কাজ করে। কাজ পেল কিনা সেটা রাতে বোঝা যায়। একটু টলতে টলতে ঘরে ঢোকে। চিৎকার চেঁচামেচি করে না। ভারি শান্ত। জটার মা লোকের বাড়ি কাজ করে। আমি স্কুল ছেড়ে কলেজে। বিশ্বকবির দু চারটে কবিতা পড়ে কবি হবার স্বপ্ন দেখছি। খাতায় লিখে ফেলছি মাঝে মাঝে। দু একটা পত্রিকায় পাঠাই, কেউ ছাপে না। অবশেষে নিজেই পত্রিকা প্রকাশ করলাম। দেয়াল পত্রিকা। পাড়ার দোকানের সামনে টাঙালাম যাতে লোকের চোখে পড়ে। একদিন জটা এলো আমার কাছে। মিনমিন করে বললো - আমার কবিতা ছাপাবা ? আমার অবাক হবার পালা - তুই কবিতা লিখিস? সে বললো - নেবা ? বললাম - এনেছিস ? দে আমাকে। হাফ প্যান্টের পকেট থেকে ময়লা, ছেঁড়া ভাজ করা কাগজ দিল আমার কাছে। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলো। বললাম - ঠিক আছে, আগে দেখি কি লিখেছিস। পরের সংখ্যায় জটার কবিতা প্রকাশ হোল। আমার মুখস্ত নেই সে লেখা তবে বিষয় মনে আছে। " আমি দুইবেলা খাতি পাইনা। খিদা পালি জল খাই। আমার এট্টা মাত্তর জামা। বাবা জামা কিনা দেয় না। " তারপর সব সংখ্যায় তার লেখা থাকতো। জটা কবি হোল। কলেজ শেষ করে একটা চাকরি পেলাম। নানা কাজে ব্যস্ত হয়ে গেলাম। পত্রিকা বন্ধ হয়ে গেল। বছর দশেক পর কবির সাথে দেখা। চুলের বাহার এরকমই। দাড়ি গোঁফ মুখে। বললাম - কি করিস এখন ? বললো - বিয়ে করেছি। আমি বললাম - ভাল খবর। তা কাজ বাজ কি করিস ? সে বললো - কিছু না। অবাক হলাম - মানে ? আয় করিসনা তাহলে বিয়ে করলি কেন ? অকপটে বললো - বারে, আমি কি করবো? বন্ধুরা জোর করে বন্ধ কারখানার কালী থানে নিয়ে বিয়ে দিয়ে দিল। জোর করলো আর তুই বিয়ে করে নিলি ? খাওয়াবি কি ? সে বললো - মেয়েটার মা নাই, বাবা আবার বিয়ে করিছে। খাতি দেয়না। খালি মারে। আর আমার বন্ধুরা বেশি ভাল না, মদ খায়, গাঁজা খায়। তাগে সাথে মিশে মিশে মেয়েটাও খারাপ হয়ে যাতিছেলো। আর জম্ম মিত্যু বিয়া সব ভগমানের ইচ্ছায় হয়। সিনি যদি বিয়ে দিতি পারেন তবে খাবারের জোগাড় সিনিই করবেন। কবি এখন আর কবিতা লেখে না। মাঝে মাঝে বাড়ি আসি। কবির সাথে খুব কম দেখা হয়। বয়সের থেকে বেশি বয়স্ক মনে হয় তাঁকে। মাথা ভর্তি কাঁচাপাকা চুল, মুখে দাড়ি। ওর বউকে প্রায়শই রাস্তায় দেখি। রোগা পাতলা। অগোছালো জীবন। জানিনা ওদের ভগমান কিভাবে রেখেছে। একদিন রাতের খবরে কবিকে দেখলাম। অস্ত্র পাচার করতে গিয়ে ধরা পড়েছে। আপাতত জেল হাজত। পরের দিন বাংলার বহুল প্রচলিত দৈনিকে ছবিসহ খবর দেখলাম। পাড়ার ওর বয়সী এক জনের কাছে খোঁজ নিলাম। আবার অবাক হলাম। অস্ত্র পাচার করা কবির পেশা। ছেলেটি আমাকে উদ্বিগ্ন দেখে আশ্বস্ত করলো ধীর ভাবে বললো - আপনি চিন্তা করবেন না। খুব তাড়াতাড়ি ছাড়া পেয়ে যাবে। বড়জোর তিন চার মাস। জানতে চাইলাম - কি ভাবে ছাড়া পাবে ? কে ওর জন্যে কোর্টে লড়বে? ছেলেটি আমার জ্ঞান দেখে হাসলো - যাদের কাছ থেকে অস্ত্র কেনে এবং যাদের কাছে বিক্রি করে তারাই ওর জামিনের ব্যবস্থা করবে, তারাই মামলা লড়বে। কারণ জটা খুব বিশ্বস্ত মানুষ। আবার জিজ্ঞেস করলাম - সে যখন জেলে থাকে তার স্ত্রীর কিভাবে চলে ? ছেলেটি বললো - দেখুন সমাজের অন্ধকার জগতের বাসিন্দারা যতই গুন্ডামি বা অসৎ কাজ করুক তারা অকৃতজ্ঞ নয়, বিশ্বস্ততার দাম দেয়। তাই সে যতদিন জেলে থাকবে তার পরিবার ঠিক বেঁচে থাকবে। আমি কিছুটা নিশ্চিন্ত হলাম। যদিও তার বিপদে আমি কখনও এগিয়ে যেতাম না। দায়সারা দায়িত্ব। অবসর নেওয়ার পর বাড়িতে সময় কাটে। পাড়ার ভাল মন্দে কখনোই নিজেকে জড়াই নি, এখনো দূরত্ব রেখে চলি। কিন্তু আগের থেকে বেশি খবর পাই। মাঝে মাঝে কবির কথা মনে পড়ে। কিন্তু খোঁজ নেয়া হয় না। আমাদের পাড়ায় অনেকগুলি কুকুর আছে। মনে হয় সব পাড়ায় ওদের দখলদারী। একটু ব্যতিক্রম আছে। আমার পাশের বাড়ির বাসিন্দা পথের কুকুরের শুভাকাঙ্ক্ষী। তার বাড়িতে চোদ্দটা কুকুর বাস করে। এছাড়া রাস্তার কুকুরদের খাবার যোগান দেয়। তাদের দেখভাল করার জন্য দুইজন মানুষ সবেতনে কাজ করে। শুনেছি কোন সংস্থা থেকে অনুদান পায়। একদিন দেখা হলো কবির সাথে। পাশের বাড়ির গেটে দুটো ব্যাগ ঝুলিয়ে চলে যাচ্ছিল। জিজ্ঞেস করলাম - কেমন আছিস ? উত্তর - ভগমান যেমন রেখেছে। ওর ভগমান কেমন রেখেছে সেটা জানতে পারলাম পাড়ার সেই ছেলেটার কাছে। সেই ছেলেটা বললো - জটা এখন অস্ত্র পাচার কমিয়ে দিয়েছে কারণ বাজার মন্দা। প্রশ্ন করলাম - তাহলে ওর সংসার চলে কিকরে? উত্তর পেলাম - বাড়ির আশে পাশে কয়েকটা কুকুর আছে। আপনার পাশের বাড়ির থেকে দুইবেলা কুকুরদের জন্য খাবার আনে। সেই খাবারে স্বামী স্ত্রীর খাবারের জোগাড় হয়ে যায়। কবির ভগমানকে আমি মনে মনে কৃতজ্ঞতা জানাই। এক মাথা পাকা চুল ও মুখ ভর্তি দাড়ি নিয়ে মাথা নিচু করে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ভূষণ্ডির মাঠে হেঁটে চলে ভূত। তাঁর জীবনে কবিতা ফুরিয়ে গেছে। ১৫/০৮/২০২৬

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Kobir golpo কবির কথা

কবির গল্প সম্পাদক মশায় তাড়া দিচ্ছেন গল্প দিতে হবে। গল্প কি হাটে মাঠে জোটে যে চাইলেই ধরে দেব। হাটে মাঠে বলতে গিয়ে ভূষণ্ডীর মাঠের কথা মন...